ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের স্মৃতি ৩
সিলেটের মাধবপুরের যুদ্ধ
-
-
|

গ্রাফিক : বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের স্মৃতি ১ ● জয়দেবপুরের গণ বিক্ষোভ
ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের স্মৃতি ২ ● আশুগঞ্জের বিমান হামলা
এরপর ক্যাপ্টেন নাসিম সাহেব তেলিয়াপাড়া থেকে আমাদেরকে সিলেটের মাধবপুরে নিয়ে আসেন। সেখানে আসার পর আমাদের সাথে বিডিআর, পুলিশ, আনসার এবং আমাদের নিজেদের হারিয়ে যাওয়া কিছু সৈনিক এসে যোগ দেয়। মাধবপুরের দক্ষিণ পশ্চিম দিক থেকে পশ্চিম পূর্বপাড় পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়া-সিলেট রাস্তা নিয়ে ডিফেন্স লাগিয়ে দেন। আমাকে এবং ল্যান্স নায়েক আব্দুল মান্নানকে যে স্থানটি নির্বাচন করে দেন সেটি অন্যান্য ভূমি থেকে কিছুটা উঁচু মাঠ এবং তার উত্তর দিয়ে একটি ক্যানেল পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়। আমরা উভয়ই ছিলাম নতুন সৈনিক। আমাকে উত্তর পাশে রাস্তা সংলগ্ন একটি বট গাছের নিচে বাংকার করতে বলেন। এবং আমার থেকে ৫০০/৬০০ গজ দূরে পশ্চিম দিকে আর একজন এলএমজি ম্যান ল্যান্স নায়েক আব্দুল মান্নানকে বট গাছের নিচে বাংকার করতে বলেন। এবং আমাদের এ দুই এলএমজির সাপোর্টের জন্য একজন এইচএমজি সৈনিক কেরামত আলীকে আমাদের ঠিক মাঝামাঝি ৩০০ পেছনে অবস্থান নিতে বলেন।
আমাদের ৮০০ গজ সামনে ঘনবসতি গ্রাম ও গাছপালা ছিল। একটি ক্যানেল উত্তর পশ্চিম দিক থেকে প্রবাহিত হয়ে রাস্তা পার হয়ে দক্ষিণ পূর্ব দিকে চলে গিয়েছে। গ্রামগুলো থেকে পূর্ব দিকে আমার সামনে নিচু আবাদি ভূমি ছিল। নাসিম সাহেব আমাকে বললেন, তুমি রাস্তা কভার করে উত্তর ও উত্তর পশ্চিম দিক থেকে যদি কোনো পাক আর্মি আসে তাদেরকে আক্রমণ করবে। এবং আব্দুল মান্নানকে বলেন, তুমি পশ্চিম ও উত্তর দিক থেকে গ্রামগুলো কভার করে ফায়ার দিবা। তোমরা দুজনে একে অপরকে ক্রস ফায়ার দিবে। আর তোমাদের পেছন দিক থেকে এইচএমজি ফায়ার দেবে। আমাদের কোম্পানির প্রত্যেক লোকের পজিশন দেখিয়ে দিয়ে নির্দেশনা দিয়ে দেন। আমরা এক রাতের ভিতরেই সিভিল লোকদের সহায়তা নিয়ে শেল্টারসহ বাংকার তৈরি করে ফেলি। পরের দিন সকালে বাংকার দেখে নাসিম সাহেব সন্তুষ্ট হন। বলেন, যদি দেখি পরিস্থিতি খারাপের দিকে তখন আমি ভেরিলাইট পিস্তলের রেডওভার গ্রিন ফায়ার দিলে তোমরা উইড্রল করবে। তার আগে তোমরা ডিফেন্স থেকে উইড্রল করবে না। সম্ভবত যতটা মনে পরে, পরদিন নাসিম সাহেব আমাদের প্রত্যেককে ২০ টাকা করে বেতন দেন। আমরা তাতেই খুশি। কেননা, এ ২০ টাকা খরচ করার মতো কোনো দোকানপাট নেই। আনুমানিক এর দুই/তিন দিন পর পাক আর্মির সম্ভবত একটি ব্রিগেড আমাদেরকে আক্রমণ করার জন্য অগ্রসর হয়।
প্রথমেই তারা অবিরাম আটিলারি গোলা নিক্ষেপ করতে থাকে। ওদিকে তাদের পদাতিক বাহিনী আমাদের ডিফেন্সের পশ্চাৎদিক থেকে আক্রমণ শুরু করে দেয়। এত বড় আক্রমণ শুরু করে যে, এ বিশাল আক্রমণের মুখে আমাদের ক্ষুদ্র বাহিনীর কোনো ক্রমেই টিকে থাকা সম্ভব নয়। সম্ভবত আধাঘণ্টা উভয় পক্ষের গোলাগুলির পর নাসিম সাহেব উইড্রল সিগন্যাল দিয়ে দিলেন। কিন্তু আমরা দুই এলএমজি ম্যান ছাড়া বাকি সকলকে পেছনের দিকে হটানোর সাহায্যে আমরা উভয়ই ফায়ার দিতে থাকি। শত্রু আমাদের খুবই নিকটে ৭/৮শ গজের মধ্যে ছিল। তারা ঐ গ্রামের ভিতরে জড়ো হচ্ছিল। সম্ভবত তাদের উদ্দেশ্য ছিল, পাকা রাস্তা অতিক্রম করে আমাদের পেছন দিক থেকে ঘেরাও করবে। কিন্তু আমাদের দুটি এলএমজির জন্য বিশেষ করে আমার এলএমজি পাকা রাস্তা সংলগ্ন থাকার জন্য এবং সামনে খোলা জায়গা থাকায় তারা পাকা রাস্তা দখল করতে পারে নাই।
শত্রুপক্ষ ও আমাদের মাঝে প্রচণ্ড গোলাগুলি চলছিল। এরই এক ফাঁকে কেরামত ভাই তার লোকসহ এইচএমজি নিয়ে উইড্রল হোন। আমরা তখন এলএমজি ফায়ার দিয়ে পাক বাহিনীকে আটকে রেখে আমাদের কোম্পানির লোকদের সম্পূর্ণভাবে পেছনে যেতে সাহায্য করতে থাকি। শত্রুপক্ষ আমাদের উপর অবিরাম গোলা নিক্ষেপ করছিল। আমাদের কোম্পানি উইড্রল হবার আধাঘণ্টা পর নাসিম সাহেব যখন দেখলেন আমরা উইড্রল হতে পারছি না তখন তিনি আমাদের বিকিউএমএইচ ফরাজ সাহেবকে সঙ্গে নিয়ে, আমাদের যেখানে এইচএমজি পজিশন ছিল তার কাছে একটি ছোট ঘর ছিল, সেই ঘরকে আঁড় করে আমাদেরকে ডাকতে শুরু করলেন এবং বললেন, তোমরা জলদি উঠে এসো। আমরা তোমাদেরকে ওভারহেড ফায়ার দিচ্ছি। তখনও মুষলধারে শত্রুপক্ষের গুলিবর্ষণ চলছে। এ পরিস্থিতিতে আমরা কিভাবে বাংকার থেকে উঠব। বাংকার থেকে উঠতে গেলে আমাদের গায়ে গুলি অথবা শেলের টুকরা লাগতে পারে। আমার চিন্তা ছিল, আমার কাছে যতক্ষণ বুলেট আছে ততক্ষণ আমি যুদ্ধ চালিয়ে যাব। সর্বশেষে ২টি বুলেট রেখে দেব নিজের জন্য। যাতে শত্রুপক্ষ আমাকে জীবিত ধরতে না পারে। বুলেট শেষ হয়ে গেলে তখন মৃত্যুকে স্বীকার করে বাঁচার জন্য উইড্রল হতে চেষ্টা করব। নাসিম সাহেব ব্যর্থ হয়ে আমাদের না নিয়ে ফিরে গেলেন। উনি আমাদের উঠে আসার জন্য আমাদের ব্যাটালিয়ানের মর্টারকে আমাদের থেকে দুই মাইল পেছনে প্রস্তুত করে রেখেছিলেন। তিনি চলে যাবার পর আমরা পাক বাহিনীর ওপর গুলিবর্ষণ করতে থাকি। আমাদের গুলি যেহেতু সীমিত সেহেতু চেষ্টা করছি হিসাব করে গুলি খরচ করে শত্রুকে হত্যা করতে। এবং শত্রু পক্ষকে আটকে রাখতে। আর মনে মনে আল্লাহকে ডাকছি। একমাত্র তার কাছেই সর্বপ্রকার সাহায্য চাচ্ছি।
স্যার চলে যাবার ১৫/২০ মিনিট পর হঠাৎ ল্যান্স নায়েক মান্নান তার এলএমজি দিয়ে লং ব্রাশফায়ার শুরু করে। আমি বাংকারের মুখ দিয়ে চেয়ে দেখি আমার বাংকারের সামনে ক্যানেলের ভেতর দিয়ে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে পাকা রাস্তা পর্যন্ত অনেকগুলো পাক সৈনিক একত্রিত হচ্ছে। আমিও তৎক্ষণাৎ কালবিলম্ব না করে আমার এলএমজিকে শক্ত করে ধরে শত্রুর দিকে লক্ষ্য করে ডানে বামে ব্যারেল ঘুরিয়ে এলএমজির লং ব্রাশফায়ার করতে থাকি। ঐ সময় ল্যান্স নায়েক মান্নান তার এলএমজি নিয়ে দ্রুত বাংকার থেকে উঠে পাকা রাস্তা পার হওয়ার সময় আমাকে ডাক দিয়ে বলে, জহির ভাই দ্রুত চলে আসুন। এ কথা বলেই সে রাস্তা পার হয়ে নিচে ক্ষেতে নেমে গেল। আমি যখন লং ব্রাশফায়ার করি তখন ক্যানেলে দিকে চেয়ে দেখি পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে বহু পাক সেনা নিহত এবং আহত হয়ে আর্তনাদ করছে। এবং ক্যানেলের পানি রক্তে লাল হয়ে গেছে। আব্দুল মান্নান চলে যাবার পর আমি সম্পূর্ণ একা হয়ে যাই। তখন আমি খেয়াল করে দেখি, আমার গুলির বাক্স প্রায় শেষ। আমি একবার ক্যানেলের দিকে আরেকবার গ্রামগুলোর দিকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে যাচ্ছি। ঐ স্থানে আমরা দুজনে সম্ভবত ১০০/১৫০ পাক সেনাকে হত্যা করি।
আব্দুল মান্নান চলে যাওয়ার ১০ মিনিট পর আমি চিন্তা করে দেখলাম, এখন আর আমার পক্ষে এখানে থাকা সম্ভব নয়। পাক সেনাদের এতগুলো লাশ দেখে আমি অনেকটাই আত্মতৃপ্তি অনুভব করলাম। এ মুহূর্তে শত্রুর হাতে আমার মৃত্যু হলেও আমার কোনো আফসোস নেই। শুধু চিন্তা ছিল আমার এলএমজি নিয়ে। কেননা, এ এলএমজিটা পাকসেনাদের দখলে চলে যাবে। আমি ভালো করেই জানি, এ যুদ্ধে আমার নাম নিশানা চিহ্নও থাকবে না। যেভাবে ওরা গণহত্যা করে যাচ্ছে। কার হিসাব কে রাখে। লক্ষ লক্ষ নিরীহ জনগণকে নির্বিচারে হত্যা করে যাচ্ছে। তার মধ্যে আমার মতো একজন নতুন সাধারণ সৈনিকের মৃত্যুর খবর কেই বা রাখবে। এটাই স্বাভাবিক। সত্যি বলতে কী, জেনারেল নাসিম সাহেব, আমাকে শত্রুর মুখ থেকে বাঁচানোর জন্য নিজের জীবনকে বাজি রেখে পরপর ২/৩ বার এগিয়ে এসছিলেন। তাই আমি তাঁর মতো কমান্ডারের অধীনে থেকে নিজেকে গর্বিত মনে করি। যুদ্ধের ময়দানে আমি সর্বদা তাঁর দীর্ঘায়ু কামনা করে মুনাজাত করতাম। আর এখনো আমি তাঁর জন্য দোয়া করি। সত্যি বলতে কী, জেনারেল নাসিম সাহেব আমাদের প্রত্যেক সৈনিককে তাঁর প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন। আমি শুনেছি, তিনি এখনো তখনকার দ্বিতীয় বেঙ্গল ও ১১ বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকদের পেলে প্রাণ খুলে কথা বলেন, কুশলাদি জিজ্ঞেস করেন।
আমি মাধবপুরের ডিফেন্স থেকে ওঠার জন্য এলএমজিকে ভালো করে কাপড় দিয়ে পেঁচালাম। সমস্ত খালি বাক্সগুলো প্যাকেটে করে কাঁধে ঝোলালাম। মৃত্যুর চিন্তা না করে মৃত্যুকে বরণ করে নিয়েই বাংকার থেকে বের হলাম। আল্লাহর নাম নিয়ে কালেমা পড়তে পড়তে দৌড় দিলাম। কোনোমতো পাকা রাস্তায় উঠে এলএমজি নিয়ে রোলিং করে রাস্তার পূর্ব পাশে নিচে ক্ষেতে পড়ে গেলাম। ঐ সময় আমার বাম হাতে বড়ো ধরনের ব্যথাও পেলাম। কিন্তু মৃত্যুর ভয়ে সেই ব্যথাকে ব্যথা মনে না করে জীবন বাঁচানোর জন্য দৌড়াতে লাগলাম। কিছু দূর দৌড়াবার পর সেই ক্যানেলটি আমার চোখে পড়ল। অধিক পিপাসা লাগায় আমি সেই ক্যানেল থেকে হাতে পানি উঠিয়ে পান করি। এমন সময় ক্যানেলের অদূরে চেয়ে দেখি পানির সাথে রক্ত ভেসে আসছে। এ দেখে আমি আর পানি পান করি নাই। খাল পার হয়ে দক্ষিণ পুব দিকে দৌড় দিলাম। তারপর দেখলাম, কতগুলো ছোট ছেলেমেয়ে স্মরণার্থী ক্যাম্প থেকে এসে পানি জগ গ্লাস হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বুঝতে পারলাম, ইতোপূর্বেও আমাদের লোকগুলো এ পথেই এসেছিল। তাদের কেউ ওরা পানি পান করিয়েছে। আমি দৌড়াতে দৌড়াতে এত ক্লান্ত এবং তৃষ্ণার্ত হয়েছিলাম যে, আমি মনে করেছিলাম, পানির অভাবে আমার জীবন এখনই বের হয়ে যাবে। আমি একটি ছোট মেয়ের কাছ থেকে একগ্লাস পানি নিয়ে পান করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলাম ঠিক ঐ মুহূর্তে নাসিম সাহেব ধমকের সুরে আমাকে পানি পান করতে মানা করলেন। আমার আর পানি পান করা হলো না। আমি ক্ষেতের ওপর শুয়ে পড়ি।
একটু বিশ্রামের পর আমাকে লবণের পানি পান করতে দেওয়া হলো। পানি পান করার পর আমি আব্দুল মান্নানকে দেখতে পেলাম। সে আমার কাছেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। চেয়ে দেখি, ওর দু হাতের চামড়া এলএমজির ব্যারেলের সাথে আটকে রয়েছে। ওর হাতের দিকে তাকালে গা শিউরে ওঠে। শুধু হাতের তালুর ও আঙুলের হাড়গুলো দেখা যাচ্ছে। জেনারেল নাসিম সাহেব ওকে তৎক্ষণাৎ আগরতলা হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। এ সময়ে আমদেরকে দেখার জন্য বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ আর্মি অফিসাররাও সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন। সম্ভবত জেনারেল সফিউল্লাহ সাহেবও সেখানে উপস্তিত ছিলেন।
মাধবপুরের আক্রমণের পর আমরা আর স্থায়ী ডিফেন্স তৈরি করিনি। এর পর থেকে অস্থায়ী ডিফেন্স নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে লিপ্ত হতাম। দিনের বেলা যার যার অবস্থানে থাকতাম। রাতের বেলা নিজেদের সুবিধা মতো জায়গা বেছে নিয়ে হাইড-আউট-এ অবস্থান করতাম। এ অবস্থার মাঝেও আমাদেরকে মাঝে মাঝে ছোট ছোট দল তৈরি করে রাতের বেলা রেড, এম্বুসসহ বিভিন্ন অপারেশন করার জন্য বিভিন্ন জায়গায় পাঠিয়ে দিতেন। [চলবে]