‘বাংলাদেশের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু হতে পারে চীন’
-
-
|

ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে চীন কি কি ক্ষেত্রে সহযোগিতা করতে পারে সেসব ক্ষেত্রগুলি চিহ্নিত করার আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির (আইডিসিপিসি) আন্তর্জাতিক বিভাগের ভাইস মিনিস্টার সান হাইয়ান।
বুধবার চীনে সফরত বাংলাদেশি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিতিদের সঙ্গে এক বৈঠকে সান হাইয়ান এ আহ্বান জানান। খবর ইউএনবি’র
চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বিশেষ বন্ধুদের একজন হতে পারে মন্তব্য করে সান হাইয়ান বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি অত্যন্ত বিশেষ কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানে অবস্থিত। আপনাদের একটি শক্তিশালী প্রতিবেশী রাষ্ট্র আছে। বাংলাদেশের জন্য স্থিতিশীল, শান্তিতে বিশ্বাসী, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাসী এবং একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করে উন্নয়নের সুযোগ ভাগাভাগি করতে ইচ্ছুক বন্ধুসুলভ এবং নির্ভরযোগ্য প্রতিবেশী থাকা অপরিহার্য।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণ বন্ধু খুঁজছে। যদিও আপনি সকল দেশের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেন, আমরা বিশ্বাস করি যে এই সমস্ত বন্ধুদের মধ্যে বেশ কয়েকটি বিশেষ বন্ধুরাষ্ট্র রয়েছে যাদের আপনারা বেশি বিশ্বাস করেন এবং সম্ভবত আপনি সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করেন। আমি বুঝতে পারি চীন সেই বন্ধু হতে পারে।’
চীনের বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ নীতিঅনেক দেশের চেয়ে স্থিতিশীল এবং অপরিবর্তিত উল্লেখ করে সান হাইয়ান বলেন, ‘আগামী মাসগুলিতে যখন বাংলাদেশে নির্বাচন, সংস্কার এবং একটি নতুন সরকার গঠনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন আমরা বাংলাদেশের সাথে আমাদের সমর্থন এবং দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখব। বাংলাদেশকে যত দ্রুত বিকশিত পথে ফিরিয়ে আনা যাবে তত ভালো।’
সিপিসি নেতা বাংলাদেশী রাজনীতিবিদদের চীনের সহযোগিতার প্রয়োজন এমন ক্ষেত্রগুলি চিহ্নিত করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আমরা চাই আপনারা সহযোগিতার আরও ক্ষেত্রগুলি অন্বেষণ করুন... যখন আপনারা সরকার গঠন করবেন, তখন আমরা কোন ক্ষেত্রগুলিতে আপনাদের জনগণ এবং আপনাদের স্বার্থের জন্য একসাথে কাজ করতে পারি তা চিহ্নিত করুন। আমরা এমন কিছু উপায় খুঁজে বের করতে পারি যা উভয় পক্ষের জন্য উপকারী হবে এবং একে অপরের উন্নয়নে ও অভিন্ন সমৃদ্ধিতে সহযোগিতা করবে।’
সান হাইয়ান আরও বলেন, ‘চীন বাংলাদেশের অনেক ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়িয়ে আসছে। আমরা আরও অনেক কিছু করতে পারি। পরের বার যদি আমি আপনার দেশে যাওয়ার সুযোগ পাই, তাহলে আমি একটি উন্নত ঢাকা দেখতে আশা করি।’
তিনি উল্লেখ করেন,‘জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর চীন বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাথে সহযোগিতা করে আসছে। আমরা সকলেই জানি, আন্তর্জাতিক দৃশ্যপট প্রায় প্রতিদিনই নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে। আমরা লক্ষ্য করেছি, গত এক বছরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি যে, যাই ঘটুক না কেন, আমাদের সম্পর্ক দৃঢ় এবং স্থিতিশীল থাকবে।’
মানুষের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি যে জনগণের সাথে একটি শক্তিশালী সম্পর্ক নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দলের সম্পর্কও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে। কারণ প্রতিটি রাজনৈতিক দল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে এবং সরকারে তাদের উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। তাই আমাদের দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা আরও বাড়ানোর জন্য আমরা বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলির সাথে সম্পর্কের উপর মনোযোগ দিই।’
চীনে সাশ্রয়ী মূল্যের চিকিৎসা পরিষেবার কথা তুলে ধরে সিপিসি’র এই নেতা বলেন, “আমাদের দক্ষতা, জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যমে আমরা আপনাদের চিকিৎসা পরিষেবা ব্যবস্থা সংস্কারে সহায়তা করতে পারি।”
বাংলাদেশি প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেওয়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মঈন খান বৈঠকে বলেন, ‘এই সফর চীন ও বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক নবায়ন করবে। দু’দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক ঐতিহাসিক। আমরা আশা করি এই সম্পর্ক আরও এক দশক নয়, হাজার বছর ধরে অব্যাহত থাকবে।’
ড. মঈন খান বলেন, ‘আট বছর আগে চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় তিনি দেশটির জন্য যথেষ্ট অর্থনৈতিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।কিন্তু পূর্ববর্তী সরকার গত আট বছরে চীনা রাষ্ট্রপতির প্রতিশ্রুত আর্থিক সহায়তার মাত্র ২৫-৩০ শতাংশ ব্যবহার করতে পেরেছিল। আমরা আশা করব, আগামী মাসগুলিতে এই আর্থিক সহায়তা পুনরুজ্জীবিত করা হবে, যা বাংলাদেশের জনগণকে ব্যাপকভাবে উপকৃত করবে।”
বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, ‘আপনার দেশ থেকে আমরা দ্বিতীয় যে সহায়তা চাই তা হল তৈরি পোশাকের কাঁচামাল। আমরা আপনাদের কাছ থেকে শিখতে চাই কিভাবে তৈরি পোশাকের কাঁচামাল (যার মধ্যে সুতাও রয়েছে) তৈরি করতে হয়। বাংলাদেশে এই শিল্প স্থাপনে আমরা আপনার সাহায্য চাই যাতে আমরা তৈরি পোশাক পণ্যের কাঁচামাল তৈরি করতে পারি। যদি আমরা এই প্রাথমিক কাঁচামাল তৈরি করতে পারি, তাহলে আমরা অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে তৈরি পোশাক সরবরাহ করতে সক্ষম হব।”
বাংলাদেশের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পের উন্নয়নে সহায়তা করার আহ্বান জানিয়ে মঈন খান বলেন, ‘আমরা আপনাদের সহযোগিতায় বাংলাদেশে কমপক্ষে একটি বৈদ্যুতিক যানবাহন উৎপাদন কারখানা স্থাপনের প্রস্তাবও করতে চাই।”
এর আগে মঙ্গলবার, চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) আমন্ত্রণে বিএনপিসহ আটটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের নিয়ে গঠিত ২১ সদস্যের প্রতিনিধিদল ১১ দিনের সফরে চীন যান।
প্রতিনিধি দলে আরও রয়েছেন-বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক কায়সার কামাল, জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম, যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান ও ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ও ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম খান, হাসান মোঃ শহিদুল ইসলাম রুবেল, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান এজেডএম ফরিদুজ্জামান, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ, গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ রাশেদ খান, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমিন এবং জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা, ড. মঈন খানের স্ত্রী এডভোকেট রোকসানা খন্দকার, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব স্ট্রাটেজিক স্ট্রাটেজিস (বিআইআইএসএস) এর গবেষক মো নাহিয়ান সাজ্জাদ খান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন।