করোনা থেকে আমরা কী শিক্ষা পেলাম?
-
-
|

ছবি: বার্তা২৪.কম
একটি সংকট আমাদের ভুল-ত্রুটিগুলোকে তুলে ধরে। সংকট যত বড় হয়, ফাটল তত গভীর হয়। যখন একটি ছোঁয়াচে রোগ মহামারিতে রূপ নেয় তখন তা থেকে পরিত্রাণের জন্য আমাদের বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি হয়ে ওঠে।
বৈশ্বিকভাবে একটি মহামারিকে যাচাই -বাছাই করার বিভিন্ন সুযোগ রয়েছে। বিশ্বায়নের যুগে একটি ছোঁয়াচে রোগের স্থানীয় ও বৈশ্বিক প্রভাব রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে, ২০০৩ সালে এশিয়ার দেশগুলোতে সার্স, ২০০৯ সালের সোয়াইন ফ্লু এবং ২০১৪ সালের ইবোলা মহামারি কীভাবে পশ্চিম আফ্রিকার দুর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কারণে ছড়িয়ে পড়েছিল তার উল্লেখ করা যেতে পারে।
একটি মহামারিকালে আমাদের সুযোগ হয় পরবর্তী মহামারির প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং আন্তঃসম্পর্ক উন্নয়নের। আমরা কোভিড-১৯ মহামারির কারণে পরবর্তী যে কোনো মহামারি প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা কেন জরুরি সে শিক্ষা পাচ্ছি।
করোনা মহামারি আমাদের যে শিক্ষাগুলো দিচ্ছে:
প্রথমত, যে কোন বড় মাপের মহামারি প্রতিরোধের জন্য বিভিন্ন সেক্টরের মধ্যে সমন্বয় ও সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। এই সংকটকালে আমরা দেখলাম মহামারি প্রতিরোধের জন্য সরকারি উদ্যোগের সাথে সামাজিক উদ্যোগও জরুরি।
মহামারিতে শুধু স্বাস্থ্যখাত নয়, অর্থনীতি, শিক্ষা, সমাজকল্যাণ খাতগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এজন্য, এ ধরনের মহামারি প্রতিরোধ করার জন্য সমন্বিতভাবে সব খাতকে পূর্ব প্রস্তুতি নিতে হবে। উদাহরণ হিসেবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথা বলা যেতে পারে। করোনা মহামারির পূর্বে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও প্রাদেশিক সরকারগুলোর মধ্যে যে সমন্বয়হীনতার সৃষ্টি হয়েছিল তার ফল এখন ভোগ করছে মার্কিন জনগণ। পক্ষান্তরে, সিঙ্গাপুর ও তাইওয়ানের মত দেশগুলো করোনা প্রতিরোধে সফলতার মুখ দেখছে। উভয় দেশই সার্স এবং সোয়াইন ফ্লুর প্রতিরোধের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এখন সফলতা পাচ্ছে।
সিঙ্গাপুর পূর্বের মহামারিকালেই তাদের চিকিৎসা সেবার উন্নয়ন করেছিল। পাশাপাশি, সিঙ্গাপুর মানব চলাচল নিয়ন্ত্রণ, রোগ বিস্তারকে মনিটরিং করাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়েছিল। সিঙ্গাপুর ও তাইওয়ান সফল হওয়ার আরেকটি কারণ হচ্ছে জনগণ ও সরকারের মধ্যে সহযোগিতার মনোভাব। কিন্তু, করোনা সংক্রমণ যেসকল দেশে জ্যামিতিক হারে বাড়ছে সেসকল দেশে জনগণ ও সরকারের মধ্য সহযোগিতার মনোভাবে কমতি আছে।
দ্বিতীয়ত, আমরা এখন বুঝতে পারছি স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন ছাড়া মহামারি প্রতিরোধ করা কঠিন। যেকোনো ছোঁয়াচে মহামারি প্রতিরোধ করার জন্য প্রথমত তার বিস্তারের প্রধান স্থলগুলোকে বের করে আলাদা করে ফেলতে হবে। এজন্য, প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দিতে হবে। স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ ও কাঠামো ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে হবে। পাশাপাশি, পর্যাপ্ত পরিমাণ স্বাস্থ্য উপকরণের সরবরাহ, স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ বেতন ও ভাতার ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু, সব দেশের পক্ষে এ ধরনের ব্যবস্থা উন্নয়নের সক্ষমতা নাও থাকতে পারে। এক্ষেত্রে, উন্নত দেশগুলোর উচিত হবে অনুন্নত দেশগুলোকে সাহায্য করা। নতুবা, অনুন্নত দেশগুলো থেকে তা ছড়িয়ে পড়তে পারে। কেননা, রোগের নির্দিষ্ট কোন দেশ নেই।
তৃতীয় শিক্ষা হলো, বিশ্বাসের সর্ম্পক গড়ে তুলতে হবে। যেকোনো মহামারি প্রতিরোধের জন্য বিশ্বাস গড়ে তুলতে হয়। এই ধরনের মহামারিকালে সরবরাহকৃত তথ্যগুলো জনগণের বিশ্বাসযোগ্য হতে হয়। এজন্য, রাজনৈতিক নেতাদের জনগণের বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন করতে হয়। করোনাকালে অনেক দেশের রাষ্ট্র নায়কেরা তা ভালভাবে বুঝে গেছে। এখন পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন জনগণের বিশ্বাস হারিয়েছেন শুধু বিতর্কিত মন্তব্যের জন্য।
অন্যদিকে, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট উচ্চ প্রশংসা পাচ্ছেন শুধু পরিষ্কার, সময়োপযোগী বক্তব্য, জনগণের বিশ্বাস অর্জনের জন্য। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক বিশ্বাস অর্জনও জরুরি। উদাহরণ হিসেবে, এই দুর্দিনে বৈশ্বিক বিশ্বাস অর্জনে আমেরিকার ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। আমেরিকা বিশ্বাস হারিয়েছে ইরানের বিরুদ্ধে এই দুর্দিনে বাণিজ্যিক অবরোধ অব্যাহত রেখে। পাশাপাশি, চীনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর মাস্ক ছিনতাইয়ের মত ঘটনা ঘটিয়ে আমেরিকা তার মানবিক রূপ ও বিশ্বাস হারিয়েছে।
করোনা মহামারির এই শিক্ষাগুলো থেকে আমাদের পরবর্তী মহামারি প্রতিরোধ যুদ্ধে আরও বেশি সংগঠিত ও কার্যকরী উদ্যোগ নিতে হবে।
মো. হাসান তারেক: প্রভাষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ডক্টর মালিকা কলেজ, ঢাকা।